আর্টিকেলে ফিরে যান
IT Bangla Media itbangla.media
এআই ও উদ্ভাবন

শুকনো নদীখাতের রকেট পরীক্ষা থেকে মঙ্গলে হেলিকপ্টার: ৯০ বছরে নাসার জেপিএল, আলোচনায় জ্যাক পারসন্স

১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর পাসাডেনার আরোয়ো সেকোতে ক্যালটেকের একদল তরুণের রকেট পরীক্ষা থেকে শুরু নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির। ৯০ বছর পূর্তিতে ফিরে দেখা জেপিএলের অর্জন, প্রতিষ্ঠাতাদের একজন জ্যাক পারসন্স ও সামনের মিশন।

শুকনো গিরিখাতে পুরোনো দিনের রকেট ইঞ্জিন পরীক্ষার প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি (এআই দিয়ে তৈরি)

আমাদের প্রতিবেদক

১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় আরোয়ো সেকো নামের শুকনো নদীখাতে রকেট ইঞ্জিন পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন ক্যালটেকের কয়েকজন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, গবেষক আর রকেটপ্রেমী তরুণ। তাঁরা তখন জানতেন না, ওই পরীক্ষা থেকেই শুরু হচ্ছে নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির (জেপিএল) পথচলা। কাল শনিবার সেই ঘটনার ৯০ বছর পূর্ণ হচ্ছে।

ওই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন জ্যাক পারসন্স। তাঁকে জেপিএল ও রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যারোজেটের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। জেপিএলের ৯০ বছর পূর্তিতে আবার আলোচনায় এসেছেন এই রকেট প্রকৌশলী।

শুকনো নদীখাত থেকে মহাকাশে

ক্যালটেকের ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, আরোয়ো সেকোর ওই পরীক্ষাকেই জেপিএলের সূচনা ধরা হয়। নাসা প্রতিষ্ঠার বছর ১৯৫৮ সাল থেকে ক্যালটেক টানা নাসার পক্ষে ল্যাবটি পরিচালনা করছে।

শুরুতে মার্কিন সেনাবাহিনীর ঠিকাদার হিসেবে কাজ করত জেপিএল। ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ এক্সপ্লোরার-১ উৎক্ষেপণ করে ল্যাবটি। উপগ্রহটির গাইগার কাউন্টার পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বিকিরণ বলয় শনাক্ত করে। এর সাফল্যের পর ১৯৫৮ সালের শেষ দিকে নাসা গঠিত হয়, আর জেপিএল চলে আসে নাসার অধীনে।

এরপর জেপিএলের হাত ধরে এসেছে একের পর এক ‘প্রথম’। চাঁদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মিশন রেঞ্জার-৪, ১৯৬২ সালের ১৪ ডিসেম্বর মেরিনার-২ দিয়ে শুক্রগ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া প্রথম গ্রহ-মিশন, চারটি গ্যাসীয় দানব গ্রহের সবগুলোতে যাওয়া প্রথম নভোযান ভয়েজার-২, প্রথম ইনফ্রারেড টেলিস্কোপ আইআরএএস, মঙ্গলে চলা প্রথম রোভার সোজার্নার এবং মঙ্গলে ওড়া প্রথম হেলিকপ্টার ইনজেনুইটি।

রকেট জ্বালানির পথিকৃৎ পারসন্স

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জ্যাক পারসন্সের জন্ম ১৯১৪ সালের ২ অক্টোবর, লস অ্যাঞ্জেলেসে। ১৯২৮ সাল থেকে স্কুলবন্ধু এডওয়ার্ড ফরম্যানের সঙ্গে বাড়িতে বানানো রকেট নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন তিনি। আর্থিক সংকটে স্ট্যানফোর্ডের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।

১৯৩৪ সালে পারসন্স, ফরম্যান ও ফ্রাংক মালিনা মিলে ক্যালটেকের গুগেনহাইম অ্যারোনটিক্যাল ল্যাবরেটরির (গ্যালসিট) রকেট গবেষণা দল গড়ে তোলেন। দলটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন গ্যালসিটের প্রধান থিওডোর ভন কারম্যান। এই দলই ১৯৪৩ সালে জেপিএলে রূপ নেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দলটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য ‘জেট-অ্যাসিস্টেড টেক অফ’ বা জেটো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে, যাতে ছোট রানওয়ে থেকেও উড়োজাহাজ দ্রুত উড়তে পারে। এই প্রযুক্তি তৈরি ও বিক্রির জন্য ১৯৪২ সালে তাঁরা অ্যারোজেট প্রতিষ্ঠা করেন। ছাঁচে ঢেলে বানানো যায় এমন কম্পোজিট রকেট জ্বালানির প্রথম ইঞ্জিনটি পারসন্সেরই উদ্ভাবন। তরল ও কঠিন—দুই ধরনের রকেট জ্বালানির উন্নয়নেই তাঁর ভূমিকা ছিল।

তবে পারসন্সের জীবন ছিল বিতর্কে ভরা। ১৯৩৯ সালে তিনি অ্যালিস্টার ক্রাউলির প্রতিষ্ঠিত গুহ্য ধর্মীয় আন্দোলন থেলেমায় যোগ দেন। ওই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং গবেষণাগারে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের অভিযোগে ১৯৪৪ সালে তাঁকে জেপিএল ও অ্যারোজেট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৫২ সালের ১৭ জুন মাত্র ৩৭ বছর বয়সে বাড়ির গবেষণাগারে এক বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু হয়। দাপ্তরিকভাবে একে দুর্ঘটনা বলা হয়েছিল।

জীবদ্দশায় তেমন পরিচিতি না পেলেও এখন তাঁকে মার্কিন মহাকাশ কর্মসূচির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়।

সামনে কী

৯০ বছর পূর্তিতে ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও তুলে ধরেছে ক্যালটেক। ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে জেপিএল পরিচালিত স্কাইফল মিশনের। মঙ্গলে নামার পথেই তিনটি হেলিকপ্টার ছেড়ে দেবে এটি। হেলিকপ্টারগুলো মাটির নিচের বরফ খুঁজবে ও ভূপ্রকৃতি জরিপ করবে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বড় আকারের প্রপালশনচালিত ড্রোন নামাতে মুনফল মিশনও তৈরি করছে জেপিএল।

২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে সানরাইজ মিশনের। টোস্টারের আকারের ছয়টি উপগ্রহ একসঙ্গে উড়ে কয়েক মাইল চওড়া একটি রেডিও অ্যান্টেনার মতো কাজ করবে এবং সূর্যের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করবে। পৃথিবীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ গ্রহাণু খুঁজতে কাজ করছে এনইও সার্ভেয়ার মিশন। নাসা ও ভারতের ইসরোর যৌথ রাডার উপগ্রহ নিসার প্রকল্পেও যুক্ত আছে জেপিএল।

প্রযুক্তির দিক থেকেও জেপিএলের অবদান কম নয়। ল্যাবটির মাইক্রোডিভাইসেস ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়েছিল সিএমওএস ‘ক্যামেরা অন আ চিপ’ প্রযুক্তি, যার কল্যাণে আজ মোবাইল ফোনে ছবি তোলা যায়।

জেপিএলের পরিচালক ডেভ গ্যালাহার বলেন, “৯০ বছর ধরে জেপিএলের নজিরবিহীন মিশনগুলো মহাবিশ্ব ও তাতে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা বদলে দিয়েছে।”

ক্যালটেকের প্রেসিডেন্ট রে জয়বর্ধনা বলেন, “শুকনো নদীখাতে রকেট নিয়ে পরীক্ষা করা সেই ক্যালটেক শিক্ষার্থীরা যদি দেখতেন এরপর ক্যালটেক ও জেপিএল কী অর্জন করেছে, আর আমরা কোথায় যাচ্ছি, তাঁরা কী ভাবতেন—আমি শুধু কল্পনাই করতে পারি।”

৯০ বছর পূর্তির কয়েক সপ্তাহ পর, ১৮ নভেম্বর আরেকটি মাইলফলক ছোঁবে জেপিএলের নভোযান ভয়েজার-১। সেদিন পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব হবে এক ‘আলোক-দিন’, অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় আলো যতটা পথ পাড়ি দেয়—প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি কিলোমিটার।

তথ্যসূত্র

সূত্র: https://itbangla.media/tech/d1klzp9xin/
© 2026 IT Bangla Media
যাচাই ও মূল লেখা পড়তে স্ক্যান করুন