ডার্ক ওয়েব, প্রযুক্তি ও প্রাণী নির্যাতন: ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষকের চোখে
প্রাণীর প্রতি যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধ ছড়াতে অনলাইন কমিউনিটি, ডার্ক ওয়েব ও এআই কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, আর তদন্তে কী দেখা জরুরি, তা নিয়ে মত দিয়েছেন ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা।
ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার অপরাধ বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রাণীর প্রতি যৌন নির্যাতন এবং এ ধরনের অপরাধে প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে মতামত দিয়েছেন। লেখাটির মূল বক্তব্য আমাদের ভাষায় তুলে ধরা হলো। এখানে প্রকাশিত মত তাঁর নিজস্ব।
জোহার মতে, একসময় এ ধরনের বিকৃত আচরণ ব্যক্তির গোপন জগতেই আটকে থাকত। এখন অনলাইন কমিউনিটি আর ডার্ক ওয়েবের কিছু অপরাধী নেটওয়ার্ক সেই আচরণ ছড়ানো, উসকে দেওয়া, এমনকি বাণিজ্যিকভাবে শোষণের সুযোগ তৈরি করছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় প্রাণীর সঙ্গে যৌন কর্মকাণ্ডের ছবি বা ভিডিও ধারণ, বিতরণ কিংবা সংরক্ষণের অভিযোগে একজনের গ্রেপ্তারের খবর এই আলোচনাকে আবার সামনে এনেছে। চ্যানেল আই অনলাইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযোগগুলো এ ধরনের ছবি ও ভিডিও নিয়েই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো প্রাণীর সঙ্গে সরাসরি যৌনাচারের যে দাবি ছড়িয়েছে, গ্রেপ্তারসংক্রান্ত নথিতে তার সুনির্দিষ্ট সমর্থন পাওয়া যায়নি।
আকর্ষণ আর অপরাধ এক নয়
লেখায় জোহা দুটি বিষয় আলাদা করেছেন। প্রাণীর প্রতি যৌন আকর্ষণকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় জুফিলিয়া (Zoophilia), আর প্রাণীর সঙ্গে যৌনক্রিয়াকে বলা হয় বেস্টিয়ালিটি (Bestiality)। তাঁর ব্যাখ্যায়, জুফিলিয়া নিজে আলাদা কোনো মানসিক রোগ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ নয়; নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত মানদণ্ড পূরণ করলে তা প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রযুক্তি কোথায় ঝুঁকি বাড়ায়
জোহা স্পষ্ট করেছেন, ইন্টারনেট নিজে এ ধরনের আকর্ষণ তৈরি করে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে অনলাইন পরিবেশ কারও আগে থেকে থাকা ক্ষতিকর প্রবণতাকে জোরালো করতে পারে। তিনি চারটি দিক তুলে ধরেছেন:
- অনলাইন কমিউনিটি: কিছু গ্রুপে এ ধরনের নির্যাতনকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হতে পারে। একই আগ্রহের মানুষ একে অন্যকে সমর্থন দিলে অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে।
- ডার্ক ওয়েব: কিছু অপরাধী নেটওয়ার্কে নির্যাতনের কনটেন্ট আদানপ্রদানের ঝুঁকি আছে। তবে এর মাত্রা নিয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সীমিত, আর ডার্ক ওয়েবের সব ব্যবহারই অপরাধ নয়।
- সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া: বারবার নির্যাতনমূলক কনটেন্ট দেখলে কারও কারও মধ্যে সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা কমতে পারে। তবে দেখলেই কেউ বাস্তবে অপরাধ করবেন, এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
- এআই ও ডিপফেক: জেনারেটিভ এআই দিয়ে কৃত্রিম নির্যাতনমূলক ছবি বা ভিডিও বানানো সম্ভব। এগুলো বাস্তব ঘটনার প্রমাণ না হলেও নির্যাতন উসকে দেওয়া, বিভ্রান্তি ছড়ানো বা অপরাধমূলক কনটেন্ট প্রচারে কাজে লাগতে পারে।
ফরেনসিক তদন্তে যা দেখা জরুরি
জোহার মতে, এ ধরনের মামলায় অভিযুক্তের মানসিক অবস্থার পাশাপাশি তাঁর ডিজিটাল কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ। আইনগত অনুমোদন নিয়ে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, অনলাইন যোগাযোগ, ছবি-ভিডিওর মেটাডেটা, ক্লাউড রেকর্ড ও ডিজিটাল লেনদেন বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। দেখতে হবে কোনো নির্যাতনমূলক কনটেন্ট তৈরি, সংরক্ষণ, প্রচার বা বিক্রির প্রমাণ আছে কি না। সেই সঙ্গে আলামতের অখণ্ডতা, চেইন অব কাস্টডি ও ফরেনসিক যাচাই নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে তিনি সতর্ক করেছেন, কারও ডিভাইসে সন্দেহজনক কনটেন্ট পাওয়া গেলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে তিনি বাস্তবে প্রাণী নির্যাতন করেছেন। বাস্তব ঘটনার সঙ্গে ডিজিটাল আলামতের যোগসূত্র আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হবে।
ভবিষ্যৎ অপরাধের সংকেত?
লেখায় বলা হয়েছে, কিছু গবেষণায় প্রাণীর প্রতি নির্যাতন ও মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিন্তু জুফিলিয়া থাকলেই কেউ ভবিষ্যতে মানুষের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ করবেন, এমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নেই। এখানে অপরাধের ইতিহাস, আচরণের পুনরাবৃত্তি, সহিংস প্রবণতা ও মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নই মূল বিবেচ্য।
করণীয় কী
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জোহা মনে করেন, এ ধরনের অভিযোগকে কৌতূহল বা হাস্যরসের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দরকার প্রাণী সুরক্ষা, প্রযোজ্য আইনের প্রয়োগ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন এবং ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতার সমন্বয়।
তাঁর ভাষায়, প্রযুক্তি অপরাধের একমাত্র কারণ নয়, তবে এর অপব্যবহার অপরাধ আড়াল করতে, ছড়াতে এবং কখনো সংঘবদ্ধ শোষণে রূপ দিতে পারে। প্রাণী সম্মতি দিতে পারে না, তাই বিষয়টি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; এটি প্রাণীর নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও আইনগত দায়ের বিষয়। ডিজিটাল যুগে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র অনেক সময় লুকিয়ে থাকে একটি মোবাইল ফোন, একটি অনলাইন অ্যাকাউন্ট কিংবা অন্ধকার ডিজিটাল নেটওয়ার্কে।
- তানভীর হাসান জোহার ফেসবুক পোস্ট, ৪ নভেম্বর ২০২৬
- চ্যানেল আই অনলাইন, ৪ নভেম্বর ২০২৬







মন্তব্য