মূল বিষয়বস্তুতে যান
বিজ্ঞাপন

মাথার খুলি না খুলেই মস্তিষ্কের চিকিৎসা: কীভাবে কাজ করে গামা নাইফ

নামে ‘নাইফ’ থাকলেও এতে কোনো কাটাছেঁড়া নেই। প্রায় ২০০টি গামা রশ্মি এক বিন্দুতে মিলিয়ে মস্তিষ্কের টিউমার ও রক্তনালির জটিলতার চিকিৎসা করা হয় এই প্রযুক্তিতে, যা প্রায় ছয় দশক ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।

গামা নাইফ নিয়ে রিলে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন চিকিৎসক ও কনটেন্ট নির্মাতা ড. ভৌমিক কাশ্যপ
ছবি: আইটিবাংলা গ্রাফিক্স (মূল ছবি: ড. ভৌমিক কাশ্যপের ফেসবুক রিল)

আমাদের প্রতিবেদক

মাথার খুলি না খুলেই মস্তিষ্কের ভেতরের টিউমার বা রক্তনালির জটিলতার চিকিৎসা কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে একটি রিল ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। চিকিৎসক ও কনটেন্ট নির্মাতা ড. ভৌমিক কাশ্যপ (Dr. Bhoumik Kashyap) রিলটির ক্যাপশনে লিখেছেন, খুলি না খুলে ‘ব্রেইন সার্জারি’ শুনতে অসম্ভব মনে হলেও তা অসম্ভব নয়; এর নাম গামা নাইফ, এবং এটি কয়েক দশক ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নাম শুনে ছুরি মনে হলেও গামা নাইফে আসলে কোনো ছুরি বা কাটাছেঁড়া নেই। এটি এক ধরনের রেডিয়েশন থেরাপি যন্ত্র। মায়ো ক্লিনিক, যুক্তরাষ্ট্রের রেডিওলজিইনফো এবং উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রযুক্তিটি কী এবং কীভাবে কাজ করে, তা এখানে তুলে ধরা হলো।

বিজ্ঞাপন
গামা নাইফ নিয়ে রিলে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন ড. ভৌমিক কাশ্যপ
ছবি: ড. ভৌমিক কাশ্যপের ফেসবুক রিল থেকে নেওয়া

গামা নাইফ কী

রেডিওলজিইনফোর তথ্য অনুযায়ী, গামা নাইফ এমন একটি রেডিয়েশন থেরাপি যন্ত্র, যা উন্নত ইমেজিং ও কম্পিউটার সফটওয়্যারের সাহায্যে মাথা ও মস্তিষ্কের ছোট লক্ষ্যবস্তুতে চিকিৎসা দেয়। লক্ষ্য অংশে তীব্র মাত্রার রেডিয়েশন দেওয়া হয়, তবে আশপাশের সুস্থ মস্তিষ্ক টিস্যু যতটা সম্ভব রক্ষা করা হয়।

এই পদ্ধতির চিকিৎসাগত নাম স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারি (এসআরএস)। মায়ো ক্লিনিক জানিয়েছে, এ পদ্ধতিতে মাথার খুলিতে কোনো কাটা বা ছিদ্র করতে হয় না। নামে ‘সার্জারি’ থাকলেও এটি প্রচলিত অস্ত্রোপচার নয়।

খুলি না খুলে কীভাবে কাজ করে

মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, গামা নাইফ গামা রশ্মি থেকে আসা ফোটন ব্যবহার করে প্রায় ২০০টি রশ্মি একসঙ্গে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পাঠায়। প্রতিটি রশ্মি আলাদাভাবে খুব কম মাত্রার, তাই যে টিস্যুর ভেতর দিয়ে যায় তার তেমন ক্ষতি করে না। কিন্তু সব রশ্মি যেখানে এসে মিলিত হয়, সেখানে রেডিয়েশনের মাত্রা ঘনীভূত হয় এবং লক্ষ্য কোষগুলো ধ্বংস করে। রেডিয়েশন কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে কোষ আর বংশবৃদ্ধি করতে পারে না।

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, গামা নাইফ যন্ত্রে সাধারণত ২০১টি কোবাল্ট-৬০ উৎস থাকে। রেডিওসার্জারি টিউমার কেটে বের করে না, বরং জৈবিকভাবে টিউমারটিকে নিষ্ক্রিয় করে।

লক্ষ্য নির্ধারণে এমআরআই, সিটি স্ক্যান বা অ্যাঞ্জিওগ্রাফির ছবি ব্যবহার করা হয়। রেডিওলজিইনফো জানিয়েছে, কিছু যন্ত্রে স্থানীয় অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে মাথায় একটি শক্ত ফ্রেম লাগানো হয়, যা ত্রিমাত্রিক স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় লক্ষ্য নির্ধারণে সাহায্য করে। নতুন ধরনের যন্ত্রে ফ্রেম ছাড়াই কোন-বিম সিটি ইমেজিং ও ইনফ্রারেড মোশন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া যায়। লক্ষ্যবস্তুর আকার ও ধরন অনুযায়ী চিকিৎসায় কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা লাগতে পারে। চিকিৎসার সময় রোগী রেডিয়েশন অনুভব করেন না।

রেডিওলজিইনফো আরও জানিয়েছে, সাধারণত একজন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, একজন মেডিকেল ফিজিসিস্ট এবং একজন নিউরোসার্জন মিলে লক্ষ্য নির্ধারণ ও চিকিৎসা পরিচালনা করেন।

কোন কোন রোগে ব্যবহার হয়

মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, গামা নাইফ প্রায়ই মস্তিষ্কের ছোট থেকে মাঝারি আকারের টিউমার, আর্টেরিওভেনাস ম্যালফরমেশন (এভিএম) নামে রক্তনালির জটিলতা এবং ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া নামে মুখের তীব্র স্নায়ু ব্যথার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অ্যাকুস্টিক নিউরোমা ও পিটুইটারি টিউমারের চিকিৎসাতেও স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারি ব্যবহার করা হয়।

রেডিওলজিইনফো জানিয়েছে, মস্তিষ্কে শুরু হওয়া বা অন্য অঙ্গ থেকে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারজনিত টিউমার, নিরীহ (বিনাইন) টিউমার, রক্তনালির ত্রুটি এবং কিছু কার্যগত সমস্যায় চিকিৎসকেরা এটি ব্যবহার করতে পারেন। মৃগীরোগ ও পারকিনসনস রোগে এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে।

কয়েক দশকের পুরোনো প্রযুক্তি

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সুইডিশ নিউরোসার্জন লার্স লেকসেল ১৯৫১ সালে রেডিওসার্জারির ধারণা তুলে ধরেন। ১৯৬৭ সালে স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটে লেকসেল, লাডিস্লাউ স্টাইনার ও বর্জে লারসন গামা নাইফ উদ্ভাবন করেন। ১৯৬৮ সালে সেখানে প্রথম গামা নাইফ স্থাপন করা হয়। অর্থাৎ প্রযুক্তিটি প্রায় ছয় দশক ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।

চিকিৎসার পর কী হয়

মায়ো ক্লিনিক জানিয়েছে, স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারি সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি ছাড়াই (আউটপেশেন্ট) করা হয় এবং বেশির ভাগ মানুষ এক-দুই দিনের মধ্যে স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারেন। তবে এর ফল ধীরে ধীরে দেখা যায়। নিরীহ টিউমার কয়েক মাস থেকে কয়েক বছরে ছোট হতে পারে, আর এভিএম বন্ধ হতে এক থেকে তিন বছর লাগতে পারে। ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও ফোলাভাবের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে; বিরল ক্ষেত্রে পরে জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশে

ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের (নিনস) ওয়েবসাইটে ‘গামা-নাইফ সার্জারি’ নামে একটি বিভাগের উল্লেখ রয়েছে। তবে বর্তমানে সেখানে এ সেবা কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি। বিভাগটির পাতাটি সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছে ২০১৯ সালে।

উল্লেখ্য, গামা নাইফ সব রোগীর জন্য উপযুক্ত নয়। কোন রোগীর জন্য কোন চিকিৎসা উপযুক্ত, সে সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরাই রোগীর অবস্থা পরীক্ষা করে নেন। এই প্রতিবেদন শুধু তথ্য জানানোর উদ্দেশ্যে, এটি চিকিৎসা পরামর্শ নয়।

তথ্যসূত্র

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

আরও পড়ুন